:

অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে কিয়ার স্টারমার: প্রতিশ্রুতি বনাম রূঢ় বাস্তবতা

top-news

২০২৪ সালের ৫ জুলাই যখন কিয়ার স্টারমার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন, তখন তাকে দেখা হচ্ছিল ব্রিটিশ রাজনীতির ‘স্থিরতা’ ও ‘স্বাভাবিকতা’র প্রতীক হিসেবে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি এখন নিজ দলের ভেতরে বিদ্রোহ এবং জনগণের তীব্র অনাস্থার মুখে।

সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির শোচনীয় পরাজয় এবং একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ স্টারমারবাদকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে স্টারমার নিজেকে ‘নিয়মনিষ্ঠ’ (Mr. Rules) হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তার সেই ভাবমূর্তি এখন ধুলোয় মিশে গেছে।

স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুটাই হয়েছিল ‘উপহার কেলেঙ্কারি’ দিয়ে। শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিলের অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত যখন সাধারণ মানুষকে ভোগাচ্ছিল, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক দামী পোশাক ও চশমা উপহার নেওয়ার খবর জনগণের ক্ষোভকে উস্কে দেয়।

অ্যাঞ্জেলা রেনারের পদত্যাগ (সেপ্টেম্বর ২০২৫): স্টারমার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারের ইস্তফা। স্থাবর সম্পত্তির কর (Stamp Duty) ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে নৈতিকতা কমিটি তাকে দোষী সাব্যস্ত করলে তিনি পদ ছাড়তে বাধ্য হন।

পিটার ম্যান্ডেলসন ও এপস্টিন বিতর্ক: ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন স্টারমার। যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সাথে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠতার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অভিযোগ ওঠে যে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

ইউগভ-এর (YouGov) সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, স্টারমারের জনপ্রিয়তা এখন মাত্র ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্রিটিশ ইতিহাসে এটি অন্যতম সর্বনিম্ন রেটিং। অথচ তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রায় ৪১১টি আসন নিয়ে এক বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে।

স্টারমার এখন দুই দিক থেকে আক্রমণের শিকার

ডানপন্থী হুমকি: নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ‘রিফর্ম ইউকে’ (Reform UK) দেশের বৃহত্তম ভোট শেয়ারের অধিকারী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অভিবাসন ও জাতীয়তাবাদ ইস্যুতে তারা লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী ভোটারদের কেড়ে নিচ্ছে।

বামপন্থী চ্যালেঞ্জ: অন্যদিকে, পরিবেশবাদী ও জনতুষ্টিবাদী নেতা জ্যাক পোলানস্কির নেতৃত্বে' গ্রিন পার্টি’ শহরের শিক্ষিত ও তরুণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। স্টারমারকে ‘অত্যধিক ডানপন্থী’ আখ্যা দিয়ে গ্রিনসরা এখন লেবার পার্টির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।

নিজ দলে বিদ্রোহ ও পদত্যাগের চাপ
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ১,৪০০-এর বেশি কাউন্সিলর পদ হারিয়েছে। এই বিপর্যয়ের পর লেবার পার্টির প্রায় ৪০০ এমপির মধ্য থেকে অনেকেই স্টারমারকে নেতৃত্ব ছাড়ার আলটিমেটাম দিচ্ছেন।

তবে স্টারমার সাফ জানিয়েছেন, তিনি পিছু হটবেন না। গত সোমবার এক ভাষণে তিনি দাবি করেন, লেবার পার্টি মুখ থুবড়ে পড়লে দেশ এক ‘বিপজ্জনক ভবিষ্যতের’ দিকে চলে যাবে।

কী অপেক্ষা করছে স্টারমারের ভাগ্যে?
স্টারমারের ছোটবেলার গল্পে আমরা জানি তার বাবা গাধাদের উদ্ধার করতেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিদ্রূপ করে বলছেন, স্টারমার এখন নিজেই এক গভীর গর্তে পড়েছেন, যেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

একদিকে অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি—সব মিলিয়ে ‘স্থিরতা’র প্রতিশ্রুতি দেওয়া এই প্রধানমন্ত্রী এখন ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য এক নতুন অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

যদি তিনি দ্রুত কোনো বড় নীতিগত পরিবর্তন আনতে না পারেন, তবে ডাউনিং স্ট্রিটে তার সময় ফুরিয়ে আসছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *